ইউক্রেনে আক্রমণ শুরুর পর নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে শত শত মার্কিন কোম্পানি রাশিয়া থেকে আংশিক বা পুরো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। তবে নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর সে পরিস্থিতি নতুন দিকে গড়ানোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, হারানো বাজার পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে না পারার আশঙ্কা সঙ্গে নিয়েই রাশিয়ায় ফিরতে পারে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কিছু কোম্পানি। মূলত ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রুশ-মার্কিন পদক্ষেপের সূত্র ধরে এ ঘোষণা এসেছে। খবর রয়টার্স।
গতকাল রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধান জানিয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) মধ্যেই বেশ কয়েকটি মার্কিন কোম্পানি রাশিয়ায় ফিরে আসতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সম্প্রতি সৌদি আরবে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবার এ ধরনের কোনো বৈঠক হলো। বৈঠকে কিছু শর্ত উপস্থাপন করে মস্কো। যেখানে দাবি করা হয়, ২০০৮ সালে ইউক্রেনকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি বাতিল করতে হবে ন্যাটোকে। এছাড়া এ জোটের সদস্যদের শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মস্কো।
নির্বাচনের প্রচারণার সময় থেকে ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলতি মাসে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছিল। যাকে ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সংকট বলে অভিহিত করা হচ্ছিল। পুনরায় আলোচনা শুরু হওয়ায় রাশিয়ায় অনেকে আশা করছেন দেশ দুটির মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কও পুনরুদ্ধার হতে পারে।
রাশিয়ান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (আরডিআইএফ) প্রধান কিরিল দিমিত্রিয়েভও মার্কিন বিনিয়োগ ফেরার বিষয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেশ কয়েকটি মার্কিন কোম্পানি রুশ বাজারে ফিরে আসবে।’
সতর্ক করে কিরিল দিমিত্রিয়েভ বলেন, ‘মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া সহজ হবে না, কারণ অনেক বাজার এরই মধ্যে দখল হয়ে গেছে।’
গোল্ডম্যান স্যাকস ও ম্যাককিনসের সাবেক কর্মকর্তা দিমিত্রিয়েভের মতে, রাশিয়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ৩২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর। এর মধ্যে মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি ও মিডিয়া খাত ১২ হাজার ৩০০ কোটি, ভোক্তা ও স্বাস্থ্যসেবা ৯ হাজার ৪০০ কোটি ও আর্থিক খাত ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। দিমিত্রিয়েভ বলেন, ‘অনেক কোম্পানি অত্যন্ত সস্তা দামে বা বড় ছাড়ে সম্পদে বিক্রি করেছে।’
গত মার্চ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুসারে, পশ্চিমা কোম্পানিগুলো মোট ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ক্ষতির শিকার হয়েছে।
কিরিল দিমিত্রিয়েভের মতে, মার্কিন জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো রাশিয়ায় খুব সফল ছিল। তারা অল্প সময়ের মধ্যে পুরনো বাজারে ফিরে আসবে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘তারা কেন রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশের সুযোগ হারাবে?’
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছিলেন, তিনি রুশ অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে চান। কিন্তু দেশটি ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তিনি জ্বালানি তেলের দাম কমাতে চান। এজন্য বিশ্বের বৃহত্তম দুই জ্বালানি তেল রফতানিকারক সৌদি আরব ও রাশিয়ার সাহায্য দরকার।
২০২২ সাল থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে শত শত মার্কিন ও পশ্চিমা কোম্পানি রাশিয়া থেকে তাদের ব্যবসা প্রত্যাহার বা বন্ধ করে দেয়। প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস কোম্পানির মধ্যে অ্যাপল রাশিয়ায় আইফোন ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এ তালিকায় রয়েছে মাইক্রোসফট, ইনটেল, এএমডি, আইবিএম ও সিসকোর মতো প্রযুক্তি জায়ান্ট। অটোমোবাইল খাতে কার্যক্রম বন্ধ করে ফোর্ড, টেসলা, জেনারেল মোটরস ও হার্লে-ডেভিডসন। একই সঙ্গে আংশিক বা পুরোপুরি পরিষেবা বন্ধ রেখেছে ম্যাকডোনাল্ডস, স্টারবাকস, কোকা-কোলা, কেএফসি জনসন অ্যান্ড জনসন, পিঅ্যান্ডজি, ইউনিলিভার, নেটফ্লিক্স, ডিজনি, ওয়ার্নার ব্রস, সনি, ভিসা, মাস্টারকার্ড, আমেরিকান এক্সপ্রেস, গোল্ডম্যান স্যাকস, জেপি মরগার চেজ, সিটিগ্রুপসহ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনেক কোম্পানি।
পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার পর দ্রুত শূন্যস্থান পূরণের উদ্যোগ নেয় রাশিয়া। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বড় কোম্পানির দখলে থাকা সরবরাহ চেইন দেশীয় উৎপাদকদের মাধ্যমে পূরণের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া মার্কিন পণ্যের বিকল্প হিসেবে চীনা পণ্য রুশ বাজারে দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছে।
রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ভবিষ্যতে আলোচনা এবং কূটনৈতিক মিশনের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা স্পুটনিক বলেন, ‘এটি মাত্র শুরু। যেন এটি থেমে যায়। কাজটি শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্যই নয়, বরং পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসন দ্বারা সৃষ্ট বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’